১৯৭১ সালের রক্তঝরা মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে পৃথিবীর বড় শক্তিগুলো যখন প্রায় নীরব, তখনই মানবতার পক্ষ নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন মাত্র ২৮ বছরের এক ফরাসি তরুণ জ্যঁ কুয়ে। বাংলাদেশের শরণার্থীদের আর্তনাদ তাকে ভিতর থেকে নাড়িয়ে দেয়। আর সেই সাড়া থেকেই ৩ ডিসেম্বর তিনি প্যারিসের অর্লি বিমানবন্দরে পিআইএ’র একটি বোয়িং ৭২০ বিমানের ককপিটে ঢুকে জানিয়ে দেন ২০ টন ওষুধ দিতে হবে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাঙালিদের জন্য।

হাতে ছিল একটি রিভলভার, আর একটি বাক্স যেটিকে তিনি বোমা বলে ঘোষণা করেছিলেন। ভেতরে আতঙ্কে থরথর যাত্রী, বাইরে থমকে থাকা ফরাসি সরকার। প্রেসিডেন্ট থেকে চ্যান্সেলর সবাই তাকিয়ে ছিলেন এই এক যুবকের সাহসের দিকে। তিনি স্পষ্ট জানান, এ দাবি তার ব্যক্তিগত স্বার্থের নয়; মানবতার পক্ষেই তার অবস্থান।
দীর্ঘ আলোচনার পর ফরাসি রেডক্রসের সহায়তায় ১ টন ওষুধ বিমানে তোলা হয় এবং বাকি সহায়তা দ্রুত পাঠানোর প্রতিশ্রুতিও দেয় সরকার। ঠিক সেই মুহূর্তে ছদ্মবেশী পুলিশ কৌশলে বিমানে উঠে জ্যঁ কুয়েকে গ্রেপ্তার করে। পরে জানা যায়, তার “বোমা”র ভেতরে ছিল কেবল কয়েকটি তার, একটি বাইবেল ও একটি ইলেকট্রিক শেভার ভীতি নয়, মানবতার প্রতীক।
জ্যঁ কুয়ে জেলে গেলেও তার দাবি জয়ী হয়। ফ্রান্স বাংলাদেশি শরণার্থীদের জন্য পাঠায় ২০ টন ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ঝড় ওঠে। এমনকি জাতিসংঘে পাকিস্তানের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত থেকে ফ্রান্স স্পষ্ট করে মানবতার পক্ষ নেয়।
২০১২ সালে মৃত্যুবরণ করা এই ফরাসি যুবক কোনো বন্দুক হাতে যুদ্ধ করেননি, তবু তার দুঃসাহসিক পদক্ষেপ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অনন্য আলোর রেখা কারণ তিনিই ছিলেন সেই মানুষ, যিনি বিশ্বের নীরবতা ভেঙে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।















